ঢাকার মিরপুরের ইতিহাস ও নামকরণ
📜 ঢাকার মিরপুরের ইতিহাস ও নামকরণ ||
ঢাকার উত্তরাংশে অবস্থিত মিরপুর আজ আধুনিক শহুরে রূপ নিলেও, এর অতীত ইতিহাস মুঘল আমল থেকে শুরু করে ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমল পর্যন্ত বিস্তৃত।
---
🏛 মিরপুর নামকরণের ইতিহাস:----
“মিরপুর” নামের উৎপত্তি ফার্সি শব্দ “মীর” (অভিজাত, সৈন্য কর্মকর্তা) এবং “পুর” (শহর/আবাস) থেকে। ধারণা করা হয়, মুঘল আমলে ঢাকার উত্তরাংশে মীর শ্রেণির অভিজাত ও সৈন্য কর্মকর্তাদের বসতি গড়ে উঠেছিল—সেখান থেকেই এর নাম মিরপুর।
কেউ কেউ বলেন, একে একসময় “শাহ আলী পুর” বলা হতো, কারণ এখানে অবস্থিত হযরত শাহ আলীর মাজারকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলের পরিচিতি ছড়িয়েছিল।
“মীর” শব্দটি ফার্সি, যার অর্থ হলো নেতা, অভিজাত ব্যক্তি বা প্রশাসনিক পদবী।
“পুর” শব্দের অর্থ “নগর” বা “শহর।”
তাই "মিরপুর" নামটি অর্থাৎ "নেতার/বিশিষ্ট ব্যক্তির শহর" বা "মহান ব্যক্তির জায়গা"—এমন কোনো অভিজাত মীরের জীবিকা বা জমি ছিল, সে সূত্রেই নামকরণ হয়েছে বলে ধারণা করা হয় ।
ঢাকা শহর প্রতিষ্ঠার (১৬১০ খ্রিস্টাব্দ) প্রাক্কালে মিরপুর ছিল তুরাগ নদীর একটি শান্ত গ্রাম। নৌযাত্রীদের জন্য এটি ছিল একটি টোলঘাট বা খেয়াঘাট, যেখানে ঢাকায় প্রবেশের জন্য অন্যদের নামে "মীর"দের জমির আশ্রয় নিতে হতো—এ কারণেই এই নাম চলে এসেছে বলে জানা যায় ।
---
🕌 মোগল ও ব্রিটিশ আমলে মিরপুর
মোগল আমলে মিরপুর ছিল গ্রামীণ কৃষিভিত্তিক এলাকা, বনজঙ্গল ও নদী দ্বারা বেষ্টিত।
শাহ আলীর আগমনের পর এখানে ইসলাম প্রচার ও বসতি স্থাপন শুরু হয়।
ব্রিটিশ শাসনামলে জমিদার ও ইংরেজ প্রশাসকরা জমির মালিকানা নেন, তবে এলাকাটি তখনো শহুরে রূপ পায়নি।
---
🇵🇰 পাকিস্তান আমলে মিরপুর
১৯৫০–৬০ এর দশকে মিরপুরে আবাসিক পরিকল্পনা শুরু হয়।
১৯৪৭-এর দেশভাগ ও ১৯৭১-এর মুক্তি-যু-দ্ধের পর প্রচুর উর্দুভাষী বিহারী এখানে বসতি স্থাপন করে। এ কারণে মিরপুরে আজও বিহারী ক্যাম্প বিশেষভাবে পরিচিত।
পাকিস্তানি সেনাদের অন্যতম শক্ত ঘাঁটি ছিল মিরপুর সেনানিবাস। মুক্তি-যু-দ্ধের সময় এ সেনানিবাস ছিল প্রতিরোধের অন্যতম কেন্দ্র।
---
🕌 হযরত শাহ আলী মাজার
মিরপুর-১ এ অবস্থিত হযরত শাহ আলীর মাজার এই এলাকার আধ্যাত্মিক কেন্দ্র। তিনি ছিলেন ১৫শ শতকের সুফি সাধক ও ধর্মপ্রচারক, যিনি ইরাক থেকে এসে মিরপুরে ইসলাম প্রচার করেন। তাঁর মাজারে আজও হাজার হাজার মানুষ মানত করতে আসে। প্রতিবছর তাঁর উরস উপলক্ষে এলাকাজুড়ে উৎসবের আবহ ছড়িয়ে পড়ে।
---
🪖 মিরপুর সেনানিবাস
পাকিস্তান আমলে প্রতিষ্ঠিত হয়।
বর্তমানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, যেখানে রয়েছে MIST (Military Institute of Science and Technology), NDC (National Defence College), DSCSC (Defence Services Command and Staff College) সহ নানা প্রতিষ্ঠান।
---
🌊 মিরপুরের নদী
মিরপুরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয় তুরাগ নদী। একসময় এর শাখা-প্রশাখা খাল দিয়ে নৌযান চলাচল হতো। নদীর ঘেঁষে অনেক গ্রাম গড়ে উঠেছিল।
---
🏟 মিরপুরের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা
🏏 শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়াম
নির্মাণ: ২০০৬ সালে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়।
নামকরণ: বাংলার বাঘ খ্যাত এ. কে. ফজলুল হকের নামে।
প্রথম ODI: ৮ ডিসেম্বর ২০০৬ (বাংলাদেশ বনাম জিম্বাবুয়ে)।
বর্তমানে বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রাণকেন্দ্র।
🐅 বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানা
পরিকল্পনা: ১৯৬০ সালে অনুমোদন, ১৯৬১ সালে পরামর্শক বোর্ড গঠন।
উদ্বোধন: ২৩ জুন ১৯৭৪ সালে মিরপুরে বর্তমান অবস্থানে।
নাম পরিবর্তন: ২০১৫ সালে “Dhaka Zoo” থেকে “Bangladesh National Zoo”।
এখন এটি দেশের সবচেয়ে বড় চিড়িয়াখানা।
---
🏙 আধুনিক মিরপুর
আজকের মিরপুর ঢাকা শহরের একটি ব্যস্ততম ও জনবহুল অংশ। এখানে রয়েছে –
শেরে বাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়াম
বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানা
মিরপুর সেনানিবাস
শাহ আলী মাজার
আধুনিক আবাসিক এলাকা (পল্লবী, রূপনগর, স্বপ্ননগর ইত্যাদি)
মিরপুরের পোশাক শিল্প ও গার্মেন্টস এলাকা
মিরপুরের কিছু অংশ গার্মেন্টস ও কাপড়ের জন্য পরিচিত।
বিশেষ করে মিরপুর-১০, ১১, ১২ নম্বর এলাকায় কাপড়ের মার্কেট আছে।
মিরপুরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
সরকারি বাঙলা কলেজ
মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ
শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থান
মিরপুর বেনারসি পল্লী
বোটানিক্যাল গার্ডেন
হোপ মার্কেট
ফ্লাইওভার
মেট্রোরেল
আইবিএসটি (IBST) ইত্যাদি
---
✅ উপসংহার
মিরপুর শুধুমাত্র ঢাকার একটি আবাসিক এলাকা নয়, বরং ইতিহাস, সংস্কৃতি, ধর্মীয় আধ্যাত্মিকতা, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি এবং আধুনিক উন্নয়নের এক অনন্য মেলবন্ধন
