বাংলা থেকে হারিয়ে যাওয়া পেশাগুলো কি কি
বাংলা থেকে হারিয়ে যাওয়া পেশাগুলো কি কি
ভূমিকা
বাংলার ইতিহাস কেবল রাজা-জমিদার বা রাজনৈতিক কাহিনির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃতপক্ষে এ ভূমির মূল প্রাণশক্তি ছিল সাধারণ মানুষ, যারা নানান পেশার মাধ্যমে সমাজকে এগিয়ে নিয়েছিল। ঢাকার অলিগলি, বাজার, ঘাট, জমিদারবাড়ি, এমনকি গ্রামবাংলার হাট-মেলাতেও এইসব পেশাজীবীরা ছিলেন একসময় অপরিহার্য।
কিন্তু সময় বদলেছে। আধুনিক প্রযুক্তি, সমাজের রূপান্তর ও নতুন কর্মসংস্থানের কারণে এসব পেশা একে একে হারিয়ে গেছে। চলুন আজ জানি সেইসব বিলুপ্ত পেশার কাহিনি।
---
দাস্তানগড়িয়া (গল্প বলা)
এক সময় ঢাকার চকবাজার, ইসলামপুর কিংবা বড় হাটে দাঁড়িয়ে “দাস্তানগড়িয়া” মানুষকে গল্প শোনাতেন। রূপকথা, ঐতিহাসিক কাহিনি, কখনো আবার ধর্মীয় শিক্ষা দিতেন তারা।
ঢাকার কোথায় দেখা যেত: পুরান ঢাকার চায়ের দোকান, বাজার, মেলা প্রাঙ্গণ।
হারিয়ে গেছে—কারণ ছাপাখানা, নাট্যমঞ্চ, পরে সিনেমা ও রেডিও-টিভি মানুষের বিনোদনের প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে।
বাইজি
জমিদার বা নবাবদের আড্ডাখানা, বিশেষত ঢাকার লালবাগ, বেগমবাজার কিংবা আর্মেনিয়ান স্ট্রিটে বাইজিরা গান, নাচ পরিবেশন করতেন। অনেকেই কলকাতা থেকে এসে ঢাকায় বসতি গড়েন।
ঢাকার কোথায় দেখা যেত: জমিদারবাড়ি, আড্ডাখানা, মেহফিল।
হারিয়ে গেছে—কারণ জমিদারি প্রথা বিলোপ ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন।
পালকি বেহারা
পালকি ছিল অভিজাত শ্রেণির প্রধান বাহন। ঢাকার নবাবগঞ্জ, চিত্তরঞ্জন এভিনিউ ও পুরান ঢাকার সরু গলিতে পালকি চলত। বেহারারা মূলত ময়মনসিংহ, রংপুর ও নদীয়া জেলা থেকে এসে এ পেশায় যুক্ত হতেন।
ঢাকার কোথায় দেখা যেত: চকবাজার, আজিমপুর, নবাববাড়ি, লালবাগ।
হারিয়ে গেছে—কারণ মোটরগাড়ি, রিকশা ও ট্রামের প্রচলন।
ভিস্তিওয়ালা (পানিবাহক)
ঢাকার পানির ইতিহাসে ভিস্তিওয়ালাদের গুরুত্ব অপরিসীম। পাইপলাইনের আগে এরা পদ্মা, বুড়িগঙ্গা বা বড় বড় পুকুর থেকে পানি তুলে চামড়ার মশকে বহন করত।
ঢাকার কোথায় দেখা যেত: সদরঘাট, আরমানিটোলা, নবাববাড়ি, ইংরেজ আমলের ব্যারাক ও অফিস।
হারিয়ে গেছে—কারণ নলকূপ, টিউবওয়েল ও আধুনিক পানির সংযোগ।
সাপুড়ে
ঢাকার হাটে-বাজারে সাপের খেলা দেখাতেন। মেলায়, বিশেষ করে শীতলক্ষ্যা ও বুড়িগঙ্গার ঘাটে, এদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
ঢাকার কোথায় দেখা যেত: সদরঘাট, ইসলামপুরের মেলা, আদি ঢাকা মঙ্গল শোভাযাত্রা।
হারিয়ে গেছে—কারণ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন ও শহরে নতুন বিনোদনের ধারা।
পাঙ্খাওয়ালা
নবাব বা ধনী ব্যবসায়ীদের দরবারে হাতপাখা বা ঝালর দিয়ে বাতাস করাই ছিল এদের কাজ। ঢাকার নবাববাড়ি, লালবাগ ও আর্মেনিয়ানদের প্রাসাদে এদের দেখা মিলত।
হারিয়ে গেছে—কারণ বৈদ্যুতিক ফ্যান ও এসির ব্যবহার।
ধুনারি
মৌসুমি পেশা—শীতকালে এরা তুলা দিয়ে লেপ, গদি, কম্বল ধুনত। পুরান ঢাকার অলিগলি, বকশীবাজার ও লালবাগের রাস্তায় বসে ধুনানি বাজানোর দৃশ্য ছিল সাধারণ।
হারিয়ে গেছে—কারণ কারখানার তৈরি কম্বল, ম্যাট্রেস সহজলভ্য হওয়া।
চরকা ও তাঁত শিল্পী
বাংলার তাঁতশিল্প বিশ্বখ্যাত ছিল। ঢাকার শাখারীবাজার, ইসলামপুর ও নারায়ণগঞ্জে তাঁতঘর ছিল। কলকাতা ও মুর্শিদাবাদ থেকেও অনেক তাঁত শিল্পী এসে ঢাকায় বসবাস শুরু করেছিলেন।
হারিয়ে গেছে—কারণ যন্ত্রনির্ভর টেক্সটাইল শিল্প।
মৃৎশিল্পী
মাটির হাঁড়ি-কলস, খেলনা ও প্রদীপ তৈরি করতেন। কামারপট্টি, পোড়ামটিয়া ও লালবাগে এদের বড় বড় ঘর ছিল।
হারিয়ে গেছে—কারণ প্লাস্টিক, অ্যালুমিনিয়াম ও স্টিল।
হাতে টানা রিকশা
ঢাকায়ও একসময় হাতে টানা রিকশা চলত, তবে কলকাতার মতো ততটা প্রচলিত ছিল না। সদরঘাট, আরমানিটোলা ও নবাবপুর রোডে মাঝে মাঝে দেখা যেত।
হারিয়ে গেছে—কারণ নৈতিক বিতর্ক ও সরকারি নিষেধাজ্ঞা।
লেছফিতা ওয়ালা
হাটে-বাজারে মহিলাদের চুল বাঁধার ফিতা, রঙিন সুতো, কাপড়ের ফিতা বিক্রি করতেন। চকবাজার, নারিন্দা ও বঙ্গবাজারে এদের দেখা যেত।
হারিয়ে গেছে—কারণ আধুনিক হেয়ার অ্যাকসেসরিজ।
গুনে টানা নৌকা
ঢাকার বুড়িগঙ্গা, টঙ্গি ও নারায়ণগঞ্জে গুনে টানা নৌকা চলত। বৈঠা বা বাতাসে না চললে নৌকা পাড় ধরে গুনে টেনে নিত শ্রমিকরা।
মূলত ময়মনসিংহ ও বরিশালের শ্রমিকরা এসে ঢাকায় এই কাজে যুক্ত হতেন।
হারিয়ে গেছে—কারণ মোটরচালিত নৌকা, লঞ্চ।
বায়োস্কপওয়ালা
গ্রামীণ মেলা ও ঢাকার অলিগলিতে কাঠের বাক্সে ছবি দেখাতেন বায়োস্কপওয়ালা। সঙ্গে থাকত ঢোল বা গান।
সদরঘাট, শ্যামবাজার ও নবাবপুরের মেলায় এদের ভিড় হতো।
হারিয়ে গেছে—কারণ সিনেমা হল, টেলিভিশন ও স্মার্টফোন।
এখনো কোথাও কোথাও টিকে থাকা কিছু পেশা
সব পেশা পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। এখনো বাংলার গ্রামাঞ্চল, ঢাকার কিছু প্রান্তিক এলাকা কিংবা কলকাতার অলিগলিতে কিছুটা হলেও টিকে আছে—
সাপুড়ে
বাংলাদেশে মেলা বা গ্রামীণ যাত্রাপালায় এখনো সাপুড়েদের দেখা মেলে। মানিকগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহের হাটে এখনো তারা খেলা দেখায়।
কলকাতার বাইরে হাওড়া, নদীয়া ও বীরভূমেও গ্রামীণ মেলায় সাপুড়ে দেখা যায়।
ধুনারি (লেপ-তোষক ধুননেওয়ালা)
শীত এলেই গ্রামীণ বাজারে, এমনকি ঢাকার আজিমপুর বা মিরপুরের গলিতেও মাঝে মাঝে ধুনারির ডাক শোনা যায়—"লেপ ধুনাইবেন?"
কলকাতার উত্তর শহরতলি ও বীরভূমে এখনো এদের মৌসুমি চাহিদা আছে।
গুনে টানা নৌকা
আগের মতো আর নেই,
কলকাতার হুগলি নদীর কিছু গ্রামীণ ঘাটে এর দেখা মেলে।
বায়োস্কপওয়ালা
শহরে প্রায় হারিয়ে গেলেও, গ্রামীণ মেলা বা “গ্রাম বাংলার মেলা” প্রকল্পে এখনো মাঝে মাঝে বায়োস্কপওয়ালা দেখা যায়।
পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, বর্ধমানের গ্রামীণ মেলায় এখনো বায়োস্কপ ঘুরে বেড়ায়।
চরকা ও তাঁত শিল্প
ঢাকার নারায়ণগঞ্জ, টঙ্গী এবং সিরাজগঞ্জে তাঁতের কারখানা আছে, তবে হাতে কলমে চরকা ঘোরানো প্রায় নেই বললেই চলে।
পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ ও শান্তিনিকেতনে কিছু তাঁতি এখনও ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন।
মৃৎশিল্পী
এ পেশা পুরোপুরি হারায়নি। কুমিল্লার পোড়ামাটির কাজ, রাজশাহীর কুমারপাড়া বা সাভারের দত্তপাড়া আজও মৃৎশিল্প টিকিয়ে রেখেছে।
কলকাতার কুমারটুলি এখনো বিশ্বখ্যাত প্রতিমাশিল্পের জন্য।
তাই দেখা যায়, অনেক পেশা একেবারে হারিয়ে গেলেও কিছু পেশা এখনো বাংলার গ্রামাঞ্চল বা কলকাতার পাড়ায় টিকে আছে। তবে এগুলোও আজ বিলুপ্তির মুখে। যদি এখন সংরক্ষণ করা না হয়, তাহলে আগামী প্রজন্ম হয়তো শুধু বইয়ের পাতায় নাম পড়ে জানবে।
উপসংহার
এসব পেশা শুধু জীবিকা নয়, বাংলার সংস্কৃতি, বিনোদন ও জীবনধারার অংশ ছিল। ঢাকার অলিগলি, বুড়িগঙ্গার ঘাট, চকবাজারের হাট—সবই একসময় এইসব পেশাজীবীদের কণ্ঠে, ঘামে, হাসিতে মুখরিত ছিল। আজ তারা নেই, কিন্তু তাদের গল্প আমাদের ইতিহাসের অংশ হয়ে রইল।
