আসসালামু আলাইকুম হাই আমি মোঃ মুনজুরুল, এই ওয়েবসাইট ভিজিট করার জন্য আপনাকে স্বাগতম।

বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার ইতিহাস জানুন (১৭৩৩–১৭৫৭)

 


বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার ইতিহাস  (১৭৩৩–১৭৫৭)

 জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়

সিরাজউদ্দৌলার জন্ম ১৭৩৩ সালের ৫ মে মুর্শিদাবাদের নবাবী পরিবারে। তাঁর পিতা ছিলেন জৈনুদ্দিন আহমেদ খান  এবং মাতা আমেনা বেগম।

তিনি ছিলেন বাংলার প্রবল শক্তিশালী নবাব আলিবর্দী খাঁ-র নাতি। আলিবর্দী খাঁ তাঁকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন এবং ছোটবেলা থেকেই উত্তরসূরি হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন।

 বিবাহ ও পারিবারিক জীবন

সিরাজউদ্দৌলা বিবাহিত ছিলেন। তাঁর স্ত্রীর নাম ছিল লুতফুন্নিসা বেগম। তাঁদের সংসারে এক কন্যা সন্তান জন্ম নেয় – সালেহা বেগম।

অর্থাৎ তিনি পরিবার-পরিজন সমেতই নবাবি জীবন অতিবাহিত করছিলেন।

নবাবি শাসন ও শাসনাধীন এলাকা

১৭৫৬ সালে দাদু আলিবর্দী খাঁর মৃত্যুর পর মাত্র ২৩ বছর বয়সে তিনি বাংলার নবাব হন।

তাঁর শাসনাধীন রাজ্য ছিল সুবিশাল –

বাংলা,

বিহার

এবং উড়িষ্যা।

এই তিন প্রদেশ মিলে সে সময়ের বাংলার নবাব ছিল ভারতবর্ষের সবচেয়ে শক্তিশালী শাসক। রাজধানী ছিল মুর্শিদাবাদ।

ইংরেজদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব

সিরাজউদ্দৌলা ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অবৈধ ব্যবসা, চুরি-চালান ও দূর্গ নির্মাণে বাধা দেন। এতে ইংরেজদের সঙ্গে সংঘাত শুরু হয়।

ইংরেজদের পৃষ্ঠপোষকতায় কিছু বিশ্বাসঘাতক দরবারি ও সেনাপতি তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে।

পলাশীর যুদ্ধ (২৩ জুন ১৭৫৭)

নবাব সিরাজউদ্দৌলার পলাশীর যুদ্ধ (২৩ জুন, ১৭৫৭)

বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা। তার শাসনকাল মাত্র এক বছর হলেও ইতিহাসে তিনি চিরস্মরণীয়, কারণ তার পতনের সাথেই বাংলার স্বাধীনতা হারিয়ে যায়। এই পতনের মূল কারণ ছিল পলাশীর যু-দ্ধ।

---

যু-দ্ধের কারণসমূহ

1. ইংরেজদের বিশ্বাসঘাতকতা

ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নবাবের অনুমতি ছাড়াই দুর্গ ও কেল্লা শক্তিশালী করছিল।

তারা অ*স্ত্র জমা করছিল, যা নবাবের দৃষ্টিতে ষড়যন্ত্র।

2. কাসিমবাজার কারখানার ঘটনা

নবাব সিরাজ কাসিমবাজারে ইংরেজদের অ-স্ত্র মজুদ দেখে ক্ষিপ্ত হন এবং কারখানা দখল করেন।

3. কালাপাহাড়ের ঘটনা (ব্ল্যাক হোল ট্র্যাজেডি)

কলকাতা দখলের পর কয়েকজন ইংরেজ সৈন্যকে বন্দী করা হয়। এর মধ্যে ৪০ জনের মৃ-ত্যু ঘটে। ইংরেজরা এই ঘটনাকে বড় করে প্রচার করে নবাবকে হেয় করে।

4. অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র

নবাবের সেনাপতি মীরজাফর, ধনকুবের জগৎশেঠ, উমিচাঁদ প্রমুখ ইংরেজদের সাথে গোপনে চুক্তি করেন।

শর্ত ছিল—যদি ইংরেজরা জেতে, তবে মীরজাফরকে নবাব বানানো হবে।


যু-দ্ধের ঘটনা (২৩ জুন, ১৭৫৭, পলাশী, নদীয়া জেলা)

সৈন্যসংখ্যা:

নবাব সিরাজউদ্দৌলার সেনা: প্রায় ৫০,০০০ সৈন্য (পায়ে হাটা, অশ্বারোহী, কামানসহ)।

ইংরেজ রবার্ট ক্লাইভের সেনা: প্রায় ৩,০০০ জন (ইউরোপীয় ও দেশীয় সিপাহী)।

যুদ্ধ শুরু হলে:

নবাবের সেনারা সংখ্যায় অনেক বেশি হলেও মীরজাফর ও অন্যান্য ষড়যন্ত্রকারীরা লড়াইয়ে অংশ নেননি।


কেবলমাত্র মীরমদন ও মোহনলাল সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করেন। মীরমদন আহত হয়ে মৃত্যুবরণ করলে নবাবের পক্ষে মনোবল ভেঙে যায়।

ইংরেজরা কা-মান ও সংগঠিত বাহিনী দিয়ে আ-ক্রমণ চালিয়ে যায়।

নবাবের বাহিনী ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে।

 যু-দ্ধের ফলাফল

নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়।

তিনি পালিয়ে মুর্শিদাবাদে ফিরে আসেন।

পরে ধরা পড়ে ২ জুলাই, ১৭৫৭ সালে

সিরাজকে হ-ত্যা করা হয়।

তার দাফন হয় মুর্শিদাবাদের খোশবাগে, ভাগীরথীর তীরে।

 ষড়-যন্ত্রকারীরা

মীরজাফর – সেনাপতি, ইংরেজদের সাথে গোপনে চুক্তি করে বিশ্বাসঘাতকতা করে।

জগৎশেঠ – ধনকুবের, অর্থ দিয়ে ইংরেজদের সাহায্য করে।

রাজবল্লভ, উমিচাঁদ, ইয়ার লুদি – নবাবের শত্রু হয়ে ইংরেজদের সাথে হাত মেলায়।

পরিণতি

1. বাংলার স্বাধীনতার অবসান – ১৭৫৭ থেকে কার্যত বাংলা ইংরেজ শাসনের অধীন হয়।

2. মীরজাফর নবাব হন, কিন্তু কেবল পুতুল নবাব। প্রকৃত ক্ষমতা ইংরেজদের হাতে চলে যায়।

3. ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বিপুল সম্পদ দখল করে, যা পরবর্তীতে পুরো ভারত দখলের পথে সহায়ক হয়।

4. সিরাজউদ্দৌলার মৃত্যু বাংলার মানুষের হৃদয়ে গভীর বেদনার জন্ম দেয়।


পলাশীর যু-দ্ধ ছিল মূলত একটি বিশ্বাসঘাতকতার যুদ্ধ। সংখ্যায় শক্তিশালী বাহিনী থাকা সত্ত্বেও অভ্যন্তরীণ দুশমনদের কারণে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব পতিত হন।

বাংলা তথা ভারতের ইতিহাসে ২৩ জুন, ১৭৫৭—এই দিনটি চিরকাল কালো দিন হিসেবে স্মরণীয়।

নবাবের পতন ও মৃ-ত্যু

যু-দ্ধের পর সিরাজউদ্দৌলা পালিয়ে নদীয়ায় আশ্রয় নেন। কিন্তু ধরা পড়েন ও মীর জাফরের হাতে বন্দি হন।

১৭৫৭ সালের ২ জুলাই বিশ্বাসঘাতক মীর মদন ও মীর জাফরের আদেশে তাঁকে হ-ত্যা করা হয়।

তাঁর বয়স তখন মাত্র ২৪ বছর।

 কবর

সিরাজউদ্দৌলার কবর আজও মুর্শিদাবাদের খোশবাগে অবস্থিত। এখানে তাঁর দাদা আলিবর্দী খাঁ ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও সমাহিত আছেন।

মীর জাফরের পরিণতি

মীর জাফর ইংরেজদের হাতের পুতুল হয়ে বাংলার নবাব হয়েছিলেন। কিন্তু ইংরেজরা তাঁকেও পরে বিশ্বাসঘাতকতা করে সরিয়ে দেয়।

তিনি জীবনের শেষ সময়ে চরম অপমান, লাঞ্ছনা আর যন্ত্রণার মধ্যে পড়ে মৃত্যুবরণ করেন (১৭৬৫ সালে)।

আজ ইতিহাস তাঁকে চিরকালের জন্য “বিশ্বাসঘাতক” নামে চিহ্নিত করেছে।

 সিরাজউদ্দৌলার স্মরণীয় দিক

তিনি ছিলেন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব।

ইংরেজ ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন।

তাঁর পতনের সঙ্গে শুরু হয় ২০০ বছরের ব্রিটিশ শাসন।

আজও তিনি তরুণ বয়সে আত্মত্যাগী এক মহান বীর হিসেবে স্মরণীয়।

উপসংহার

সিরাজউদ্দৌলার মৃত্যু কোনো ব্যক্তির পতন নয়, বরং একটি জাতির স্বাধীনতার অবসান।

তাঁর নাম আজও প্রতিটি বাঙালির মনে জাগায় বেদনা, গর্ব ও প্রতিবাদের শক্তি।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url